Rayenda Ghat
লঞ্চঘাটের ব্যাপারে দিনরাত মানুষ কথা বলেন নিজেদের মধ্যে এলাকায়। রাস্তার যোগাযোগে তাদের হচ্ছে না, নৌযোগাযোগ ফের চালু হওয়া দরকার। আমি এমন অনেক লোকের সাথে লম্বা আলাপ করেছি। সেখান থেকে কিছু কাহিনী তুলে ধরছি। তাহলে আপনারাও বুঝতে পারবেন কেনো তাদের নৌযোগাযোগ দরকার।

সুন্দরবনের জেলা বাগেরহাটে আমার উপজেলা শরণখোলা। কিন্তু আমাদের উপজেলা সদরের লোকাল নাম রায়েন্দা বাজার। রায়েন্দা খালের মুখে বলেশ্বর নদীর পারে বসে আছে রায়েন্দা লঞ্চঘাট। বেকার বসে আছে। লঞ্চ আসে না আর।

সারাদেশের সাথে শরণখোলার যোগাযোগ এখন রাস্তার। বাস আর ট্রাকে মানুষ আর মালামাল শরণখোলায় আসে যায়। রায়েন্দার টার্মিনালটা বলেশ্বরের মাঝে বসে আছে, নদীর কিনার থেকে প্রায় ২০০ মিটার ভিতরে। ঘাটে কোন লঞ্চ ভেড়ে না আর। বলেশ্বরে চরা পড়ছে, লঞ্চ বা কার্গো জাহাজ ভিড়তে পারে না।

এলাকার প্রচুর লোকে বলে, লঞ্চ-স্টিমার আবার চালু হওয়া দরকার। এবিষয়ে দিনরাত মানুষ কথা বলেন নিজেদের মধ্যে এলাকায়। রাস্তার যোগাযোগে তাদের হচ্ছে না, নৌযোগাযোগ ফের চালু হওয়া দরকার। আমি এমন অনেক লোকের সাথে লম্বা আলাপ করেছি। সেখান থেকে কিছু কাহিনী তুলে ধরছি। তাহলে আপনারাও বুঝতে পারবেন কেনো তাদের নৌযোগাযোগ দরকার।

রায়েন্দা বাজারের একজন দুলাল হোসেন হাওলাদার। ঢাকা এবং দেশের আরো দূরের এলাকা থেকে শরণখোলায় মালামাল আমদানি করেন হাওলাদার সাব। জাহাজে বা লঞ্চে যেই মাল আনার খরচ ছিল ধরেন তিন হাজার টাকা, সেই মালই এখন ট্রাকে আনতে লাগে দশ থেকে বারো হাজার। লাভের মুখ দেখাই কঠিন হইয়া উঠতেছে, বললেন হাওলাদার সাব। অনেক বেশি দামে বেচতে হয় এখন, কাস্টমাররাও হইচই করে। আবার, দাম এতো বেশি পড়ে যায় যে, অনেক জিনিস শরণখোলার লোকেরা এখন শরণখোলায় কেনেই না আর! বিভিন্ন কাজে যখন বাগেরহাট-খুলনা-ঢাকার মতো বড়ো শহরে যায়, তখন কিনে নিয়ে আসে। দুলাল হোসেন হাওলাদারের আক্ষেপ, লঞ্চ না থাকায় শরণখোলার বাজার থেকে পয়সা চলে যাচ্ছে বাইরে।

রায়েন্দা ঘাটে যখন লঞ্চ চলাচল ছিল তখন লঞ্চঘাট ঘিরে কুলি, দিনমজুর, বাদাম-নারিকেল চিড়া বেচা, এমন বহু মোবাইল ব্যবসা ছিল, তাতেই ভাত-কাপড় জুটতো অনেকের। তারা অনেকেই এলাকা ছাড়া এখন, শরণখোলায় তাদের ভাত জোটাবার উপায় নাই আর। কেউ বা কৃষিতে ঢোকার চেষ্টা করলো, কেউ বা মাছ ধরায়; বাকিরা খুলনা-চট্টগ্রাম-ঢাকায়  গেলেন বাধ্য হইয়াই। পড়ে আছে মলিন ঘাটের মুখ, ঘাটে যাবার রাস্তার দুইপাশে বন্ধ-ভাঙা দোকান। ব্যবসা হারানো এমন একজন হলেন সুনিল চন্দ্র হৃষি। এক সময় তিনি রায়েন্দা টু ঢাকা লঞ্চে জুতা মেরামত করে সাত জনের সংসার চালাইতেন। এখন তার কাজের জায়গা বন্ধ হওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে দারুণ মুসিবতে দিন পার করতেছেন।

রায়েন্দা লঞ্চঘাট, শরণখোলা।

রায়েন্দা ঘাটের কাছেই মেকানিক মো. তহিদুজ্জামান ডালিম ফিটারের ব্যবসা ছিল, মেসিন মেরামতের দোকান। মেসিন ফিট করতেন বলে তার নাম হয়ে গেছে ফিটার। তিনি বললেন, ‘যখন ঘাটে লঞ্চ যাতায়াত ছিল তখন মেসিন মেরামতের ব্যস্ততায় আমি ও আমার কর্মচারিরা অনেক সময় দুপুরে খাওয়ার সময়ও পাইতাম না। এখন ঘাট অচল হয়ে যাওয়ায় আমরা সবাই এক লগে বেকার।’ লঞ্চ যখন চালু ছিল তখন রায়েন্দা ঘাটের ইজারাদার ছিলেন ফিটার। বললেন, রায়েন্দা খাল ও খালের মোহনায় নদীতে চর পড়ার কারণে লঞ্চ বা অন্য কোন বড় জলযান ঘাটে আসতে না পারার কারণে নৌপথের যাত্রী যেমন কমে গেছে তেমনি ঘাটের ইজারায় রাষ্ট্রের খাজনাও বন্ধ।

রায়েন্দা খালের পাড়ে শরণখোলা উপজেলার সরকারি খাদ্য গুদাম। কার্গো জাহাজে চাল-গম আসতো এই গুদামে। এখন ভরাট খালে কার্গো জাহাজ ঢোকে না আর। চাল-গম এখন আসছে ট্রাকে। খরচ বেড়ে গেছে তাতে অনেক। একটা কার্গো জাহাজে যেই পরিমাণ মাল আনা যায় একবারে ততটা মাল ট্রাকে আনতে তেল-গ্যাস পোড়াইতে হয় বহুগুণ। টাকার খরচ বেশি হয়, দূষণও বেশি হয়।

এছাড়াও আমাদের শরণখোরার মানুষ অসুখবিসুখে ঢাকা অথবা খুলনাতে উন্নত চিকিৎসা করাতে গেলে বাস বা রিজার্ভ গাড়ি লইতে হয়। তাতে রোগীর যেমন কষ্ট বাড়ে তেমনি খরচও অনেক বাড়ে। বলেশ্বরের ওপাড়ে বড় মাছুয়া ঘাটে অবশ্য সরকারি জাহাজ আসে। প্যাডেল স্টিমার। সেই বৃটিশ আমলের জাহাজ কয়েকটা; সেই জাহাজ আসা যাওয়ায় লঞ্চের তুলনায় সময় অনেক বেশি লাগে। নতুন জাহাজও আছে একটা, কিন্তু সেইটাও ধীরেই চলে। সেই জাহাজ ধরতে ট্রলারে পার হইতে হয় বলেশ্বর। খরচ এবং সময়— সব দিকেই লোকসান।

আমাদের শরণখোলাতেই আছে সুন্দরবনের একটা রেঞ্জ। আগে সারা দেশ থেকেই বহু মানুষ সুন্দরবন দেখতে শরণখোলা আসতো। ট্যুরিজমের কারণে শরণখোলার অর্থনীতির মজবুত থাকতো, ট্যুরিস্ট গাইডসহ বহু মানুষের কাজের মওকা ছিল ট্যুরিজম। কিন্তু এখন সুন্দরবন দেখার জন্য শরণখোলায় মানুষ তেমন আসে না।

রাস্তা-ব্রীজ যোগাযোগের দরকারি সব জিনিস। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে, নদী যেই দেশে মাকড়সার জালের মতো ছড়ানো, এমন একটা দেশে যোগাযোগের একনম্বর উপায় হবার কথা পানি পথ। কিন্তু রাস্তা-ব্রিজই যখন উন্নয়নের মিটার, তখন বিপদ নেমে আসে দুলাল-ডালিম-সুনীলদের মত অনেক পরিবারের জীবনে।

সরকার রাস্তা বানাইয়া দিছে, শরণখোলা টু বরিশাল বা খুলনা থেকে আসা-যাওয়ায় দুই-একটা ফেরি পার হইতে হয়; তবে নদীতে ব্রিজ হইতেছে এখন; আর কয় বছর পরে এক নাগাড়ে রাস্তা, ফেরির ব্যাপার থাকতেছে না আর। আসা-যাওয়ার সময় কমবে, অল্প সময়ে জরুরি সব দরকার মেটাতে পারবে মানুষ। বড় বড় শহরের সাথে শরণখোলার মানুষের আরো ঘন সম্পর্ক এখন। মানুষ ঘুরতে যায়, চাকরি করে। সারা দেশের মানুষ অল্প সময়ে সফরে আসতে পারে শরণখোলা, এই উপজেলার সুন্দরবনে গিয়ে ঘুরে আসতে পারে। উন্নয়নের ব্যাপারটা এমনই, গতি বাড়ছে অনেক শরণখোলার।

কিন্তু ভাটির বাংলাদেশে নদীগুলায় চরা পড়তেছে। এমন দশায় আমাদের নদীর দিকে সরকার মন না দিয়া যদি কেবল রাস্তা-বিজে নজর দেয় তাহলে শরণখোলার মতো মানুষের কষ্টের লগে নদীরাও বাঁচবে না। বলেশ্বরে শীতকালে দরকারি পানি না আসায় ইদানিং সাগরের লোনা পানি ঢুকতেছে, তাতে কঠিন হইয়া উঠছে শরণখোলার চাষাবাদও।

 

সুজন বালা: রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সুজন বালা। আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের সহায়তায় ভয়েস পরিচালিত প্রকল্পে (২০১৮ সালে) তিনি কমুনিটি স্টোরিটেলিংয়ের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ চলাকালে তিনি এই কাজটি করেছেন।