ভোলা এবং বলেশ্বর নদীর পাড়ে বেড়িবাঁধে ঘেরা আমাদের শরণখোলা। হারিকেন-ঘূর্ণিঝড়-সুনামির তুফানে মানুষের জানমাল রক্ষা করে এই বেড়িবাঁধ। কিন্তু ভোলা নদীর এই বেড়িবাঁধের বাইরেই নদীর চরে থাকতে হয় প্রায় দশ হাজার মানুষকে, যাদের নিজেদের বসতভিটা বা চাষের জমি নাই।

ভোলা নদীর এপাশে সাবেক সুন্দরবন, এখন আর বন নাই, শুধু জনবসতি। নদীর ওপাশে বর্তমান সুন্দরবন। বাগেরহাটের এই শরণখোলায় সোনাতলা গ্রামে দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে বসতি করে আছেন মো. আনছার হাওলাদার। বেড়িবাঁধের বাইরে ভোলা নদীর পারে এই সোনাতলা গ্রাম। নদীর পাড়ে কেমন আছেন আনছার হাওলাদার এবং অন্যান্যরা।

‘আল্লাহ যেমন রাখছে তেমন আছি,’ আমাদের বললেন হাওলাদার। তিনি জানালেন, এখানে প্রথম যখন বসতবাড়ি বানাইয়া থাকা শুরু করেন তখন এখানকার চর ছিলো শ’খানেক ফিট চওড়া মাত্র, কিন্তু এখন এখানকার চর দিগেপাশে প্রায় এক কিলোমিটার। তখন ভোলা নদীর যৌবন ছিলো, ছিলো অনেক জাতের মাছ, কুমির, শুশুক এবং কত কত ধরনের কাকড়া। এখন সেসবের তেমন কিছুই নেই। নদী ছিল প্রায় দেড় কিলোমিটার চওড়া, সেই নদী এখন চর পড়ে অনেক ছোট হয়ে গেছে। আনছার সাহেব পেশায় একজন কৃষক এখন, কিন্তু এক সময় তিনি বনের মধ্যে নদীতে মাছ ধরতেন। নদী বদলে গেছে, বনের নিয়ম কানুন পাল্টেছে ‘গভর্নমেন্ট’, তার পেশায়ও পরিবর্তন এসেছে। আনছার সাহেবের সাথে দেখা করতে সকালে গেলাম আমরা, দুপুর পর‌্যন্ত অনেক কথা জানা হলো।

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় মানুষের বসতি আর সুন্দরবনের মাঝে বইছে আনছার সাহেবের ঘরের পাশের ভোলা নদী। সুন্দরবনের কোল ঘেষা ভোলা নদীর পাড়েই শরণখোলা উপজেলার বড় একটি অংশ। মোবাইলে তোলা ছবি।

তার মুখেই শোনা যায় এখানকার মানুষের কঠিন জীবনের কথা, এখানে বর্ষাকালে পানিতে থৈথৈ করে, চলাচলের রাস্তার কাদায় হাঁটু ডুবে যায়। কাছাকাছি তেমন বড় কোন হাটবাজার নেই। এ সময় তাদের পড়তে হয় দারুণ বিপাকে। খাবার সংকটে অনেককেই না খেয়ে থাকতে হয়। এ সময় বৃষ্টির পানি পান করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় থাকে না। কিন্তু এখানকার প্রায় কেউই সচ্ছল না হওয়ায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুব্যবস্থা নাই; ফলে পড়তে হয় বিপদে। এছাড়া কৃষির অবস্থা জানতে চাইলে তিনি জানালেন প্রথমে যখন এখানে তিনি আসেন তখন ধানের ফলন ছিলো অনেক ভালো এবং কোন সার ও কিটনাশক দিতে হতো না। কিন্তু এখন সার ও কিটনাশক না দিলে ফসল ভাল হয় না, জানালেন তিনি।

সোনাতলা গ্রামের কুলসুম বিবি বললেন, তার স্বামী ছোটখাট ব্যবসা করেন, তিনি করেন ঘরের কাজকাম, গিন্নি। এই এলাকায় কুলছুম বিবি আছেন প্রায় বাইশ বছর ধরে, সে এখানকার অনেক উত্থান পতন নিজ চোখে দেখেছেন। জানালেন, ‘আল্লাহ অনেক ভাল রাখছেন, খাইয়া দাইয়া ভালোই আছি।’ তারপর বললেন, বৃষ্টির মৌসুমে এখানকার গিন্নিদের দুর্দশার আর শেষ থাকে না; লাকড়ির অভাবে তখন চুলা জ্বালানোই মুশকিল হইয়া পড়ে। এই সময় নদীতে পানি বাড়ে, রান্না ঘর পানিতে তলিয়ে যায় প্রায় সব বাড়ির। তাই এই সময় অনেকেই থাকার ঘরে আলগা চুলায় রান্নার কাজ চালায়। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় গর্ভবতী মায়েদের বাচ্চা প্রসবের সময় ভোগান্তিতে পড়তে হয়। হাসপাতাল দূরে থাকায় অনেক সময় পথেই গর্ভপাত হয়– এমন নজির অনেক। আবার অনেকে মারাও গেছে। এভাবেই অনিশ্চয়তায় কাটছে তাদের জীবন।’

নিজেদের বসতভিটা, বা চাষের জমি না হলে এমনই অসহায় জীবন যাপন করতে হবে ভোলা নদীর পাড়ের লোকেদের। মোবাইলে তোলা ছবি।

বেড়িবাঁধের বাইরে বউ-বাচ্চা লইয়া থাকছেন তেমনই আরেকজন শাজাহান মিয়া। তার জীবনের গল্পটার শুরু শরণখোলার রায়েন্দা বাজারের কাছেই। তার জবানে অল্প কথায় এমন, ‘বলেশ্বর নদীতে মাছ ধরতাম, আছিল ছোট্ট নৌকা আর জাল। তারপর রায়েন্দা খালে বান মারলো, আর মোর জীবন উল্টাপাল্টা হইয়া গেল। মোর বাড়ি আছিল রায়েন্দা খালের পাড়ে, আরো ভিতরে। আগে তো নৌকা লইয়া বলেশ্বরে যাইতাম, মাছ ধইরা বাজারে বেচতাম; তারপর নৌকা আইনা বাড়ির ঘাটে বাইন্ধা রাখতাম। খালে বান মারার পরে জাল-নৌকা রাইখা আসতে হইতো বানের ওই পাশে, মোর বাড়ি থিকা পেরায় এক কিলোমিটার দূরে। কয় বার চুরি হইলো নৌকা, দাদন লইয়া আবার কিনলাম জাল, আবার চুরি। আর টিকতে পারলাম না। তারপর মেজর জিয়ার লগে চইলা গেলাম দুবলার চরে। মাছ ধইরাই খাইতাম। পরে তো আমাদের নামে মামলা-টামলা হইলো, আর তো থাকতে পারলাম না, খেদাইয়া দিলো আমাদের। তারপর থিকা এইখানেই থাকতেছি। চেয়ারম্যান-মেম্বার ধইরা এইহানে থাহার জাগা পাইছি। মাছ ধরি, আবার কামলা খাটি; দুই কামেই সংসার চালাই।’

বেড়িবাঁধের বাইরে এখানে কুলসুম বিবি, এবং আনছার ও শাজাহান সাহেবের মতো শরণখোলার প্রায় দশ হাজার মানুষ বাস করেন। প্রায় কারোই নিজের বসতভিটা বা চাষের জমি নাই। সুন্দরবনের কোল ঘেষা ভোলা নদীর পাড়েই বেড়িবাঁধের বাইরে মানুষের এই বসতিতে ঝড়-জলোচ্ছাসে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি । তাছাড়াও এই সব গ্রামে প্রায়ই শোনা যায় অন্যান্য ধরণের আতঙ্ক, ভয় ও নৃশংসতার খবর। ডাকাতি, লুটতরাজ ইত্যাদি আগে প্রায়ই বাঘের আনাগোনার খবর শোনা যেতো। এখন কমেছে। নিজেদের বসতভিটা, বা চাষের জমি না হলে এমনই অসহায় জীবন যাপন করতে হবে ভোলা নদীর পাড়ের লোকেদের।

 

রাজ্জাক হোসেন: শরণখোলা নিবাসী রাজ্জাক হোসাইন পড়াশোনা করেন কলেজে। আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের সহায়তায় ভয়েস পরিচালিত প্রকল্পে (২০১৮ সালে) তিনি কমুনিটি স্টোরিটেলিংয়ের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ চলাকালে তিনি এই কাজটি করেছেন।