শাফিয়া
সন্তানরা গরিব থাকুক, তা চাননা শরণখোলার লোকেরা। চাষ করার মত যথেষ্ট জমি নাই, তারওপর কাজে না গিয়ে ছেলেমেয়েরা পড়ছে যেহেতু, তাই সংসারে খাবারাদি-কাপড়চোপড় সরবরাহ ঠিক রাখতে সাগরমুখো জেলেপেশায় নামছেন এককালের ক্ষেতচাষীরা।

এখন দুই হাজার আঠারোর নভেম্বর পার হয়ে যাচ্ছে প্রায়। প্রায় দুইমাস আগে শাফিয়ার মেয়ের জামাই বাবুল সাগরে গেছিলেন মাছ ধরতে। ঝড়ে নৌকা ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন মেয়ের জামাই। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ওই দুর্ঘটনা। শাফিয়া পাগলের মত হয়ে গেছেন। রায়েন্দা বাজারের পাশে বাড়িতে আমাদের সাথে যখন তার দেখা হয়, কান্না করার জন্য কথা বলতে পারেন না প্রায়। তার মেয়েটা, হালিমা, ছেলে সন্তান নিয়ে ঘর বন্ধ করে কান্না করেন নিজের বাড়িতে, কথাই বলেন না। মেয়ের জামাইয়ের দুঃখে, মেয়ের দুঃখে শাফিয়া পাগলের মত হয়ে গেছেন। পুরুষ মানুষ যাকেই দেখেন শুধু বলেন জামাইয়ের খোঁজ নিতে, সরকারি লোকেরা সাগরে যদি তার জামাইকে খুঁজে দেয়।

শরণখোলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে আলাপ করেছি আমি। কর্মকর্তা বিনয় কুমার রায়ের সাথে আলাপে বুঝতে পারলাম, শুধু শরণখোলা কেনো, দেশের কোথাও এমন ব্যবস্থা নাই যে ঝড়ে বা দুর্ঘটনায় সাগরে মাছধরার নৌকা ডুবে গেলে কোনো সংস্থা বা বাহিনী মাঝিদের উদ্ধার করার জন্য খুঁজবে। নিখোঁজ জেলেদের সংখ্যা, নাম-ঠিকানা ইত্যাদির হিসাব রাখা, ইত্যাদিরও কোনো ব্যবস্থা নাই। শরণখোলায় এর আগে অনেক এমন ঘটনা ঘটছে। যেকোনো গ্রামে গেলে এমন কয়েক ঘর পাওয়া যায়, যাদের এক বা একাধিক স্বজন সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে এভাবে হারিয়েছেন।

শরণখোলার সমুদ্রগামী নৌকাগুলোর একটা বড় অংশ মাছ ধরতে যায় সুন্দরবনের নিচে সাগরে। ফলে কখনো এমন হয়েছে যে ঝড়ে পড়ে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে গিয়ে চরে ঠেকেছেন বাংলাদেশি জেলেমাঝি। ভারতের জেলে অনেক বছর কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন অনেক জেলেমাঝি। কিন্তু দুর্ঘটনার পরপর জানবার কোনো উপায় নাই স্বজনটি ভারতের বনে বা চরে গিয়ে প্রাণে বেঁচে কারাগারে আছেন কি না।

সব পরিবারগুলো বলছে, রাষ্ট্রের কেউ এসে তাদের কখনো জানাননি যে দুর্ঘটনায় পড়া জেলেদের খোঁজা হয়েছিল কি না। ফলে মা-বাবা-স্ত্রি-সন্তানদের দিন কাটে এক অন্যরকম যন্ত্রণার মধ্যে। তাদের স্বজন জীবিত না মৃত এই সিদ্ধান্তও তারা নিতে পারেন না। তবুও শরণখোলার জেলেরা নিয়মিতই যাচ্ছেন সাগরে মাছ ধরতে। যাদের বংশে কেউ কোনোদিন সাগরে যাননি তারাও এখন যাচ্ছেন। ক্ষেতে খামারে কাজ করে সংসার আর চালানো যাচ্ছে না। তাই বাড়তি আয়ের জন্য সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন অনেকে।

রায়েন্দা মাছঘাটের নৌকা
এই এরকম সব বোট শরণখোলা উপজেলার বড় মাছ ঘাট— রায়েন্দা বাজার ঘাটে। মৎস্য অফিসের তথ্যমতে উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫৯২৫ জন। সাগরে যায় এমন বোট কতটি? সেই তথ্য নাই। তবে নিবন্ধন আছে এমন বোট একশটি বলেন জানালেন মৎস্য কর্তা বিনয় কুমার রায়। বোটের নিবন্ধন উপজেলা কর্তৃপক্ষ করে না, মৎস্য অধিদফতর করে না। বোট নিবন্ধনের কাজ করে শিপিং মন্ত্রণালয়। তাদের থেকে জেনে আমাকে জানালেন তিনি। এটা মোবাইলে তোলা ছবি।

শাফিয়ার মত দিন আসতে পারে তারও, এমন খারাপ চিন্তা মাথা থেকে দূরে রাখতে বেশ চেষ্টা করতে হয় জিলবুনিয়া গ্রামের লুৎফুন্নেসার। লুৎফুন্নেছা মনে করেন এই বয়স চল্লিশ না হতেই তার চুলে পাক ধরেছে এর কারণ হচ্ছে স্বামী গেলে তাকে চিন্তায় চিন্তায় থাকতে হয়। স্বামী তোফাজ্জেল খানের সাথে সংসারে তাদের ছেলেমেয়ে চারজন, তিন মেয়ে, এক ছেলে। কাউকেই কাজে পাঠাতে চাননা চল্লিশোর্ধ তোফাজ্জেল খান। তিনি বললেন, মাছ ধরতে সাগরে তিনি যেতে চান না আসলে। কিন্তু টাকাপয়সা তো বেশি নেই কিছু যে অন্য ব্যবসাপাতি করবেন। ফলে চার সন্তানকে একটু ভালো খাইয়ে পরিয়ে পড়াশোনা করানোর জন্য জেলেমাঝি হয়ে শ্রম দেয়াই একমাত্র ভরসা।

ছেলেমেয়েরা তাদের মত গরিব থাকুক এটা চাননা ফারুক হাওলাদারের মত গরিব লোকেরা। ফলে আয় রোজগারের কাজে, কিংবা বাড়ির কাজেও ছেলেমেয়েদের লাগতে দিতে চান না তারা। ফলে পরিবারের একমাত্র কামাই-রোজগারের লোক হিসেবে বেশি পরিশ্রম করতে হয় পুরুষদের। চার-পাঁচদিনে আমি যত জেলেমাঝির সাথে কথা বললাম, মোটামুটি একই গল্প।

জিলবুনিয়া গ্রামেই কথা হলো জেলে ফারুক হাওলাদারের সাথে। ফরায়েজ সূত্রে বাপের তিন কাঠা জমি পেয়েছেন তিনি। ওই জমিতে ঘর বানিয়ে সংসার শুরু করেছেন। চাষের জমি নাই। বড় হওয়ার পর রিকশা-ভ্যান চালাতে শুরু করেন। এখন বয়স প্রায় পয়তাল্লিশ ফারুক হাওলাদারের। বললেন, সব ভ্যান এখন বিদ্যুতের ব্যাটারিতে চলে। ব্যাটারি চার্জ দেয়ার খরচ পরিশোধের পর দিনে দেড়শ’ টাকার বেশি আর থাকে না। দেড়শ’ টাকায় তো আর পাঁচ জনের সংসার চলে না। সেই কথা জানেন ফারুকের স্ত্রি, তারপরও তিনি সাগরে যেতে নিষেধ করে স্বামীকে। ‘জীবন হাতে’ নিয়াই সাগরে প্রতিবার মাছ ধরতে যাওয়া লাগে তার স্বামীর, তিনি চান মরণ যেনো সাগরে না হয়। তবে তার প্রাণপণ ইচ্ছা, সন্তানেরা কেউ যাতে সাগরের জেলে না হয়।

তিনজন ছেলেসন্তান তাদের। ফারুক বললেন, বড় ছেলেটা ক্লাস ফাইভ-এর পড়ে আর পড়তে পারে নাই, কাজে যোগ দিতে হইছিলো। বাকি দুই ছেলে পড়াতে চান তিনি। সেই জন্য সমুদ্র-গামী মাছধরা নৌকায় শ্রম দেয়া তার সামনে একমাত্র উপায়। মাছ সবচে ভালো পাওয়া যায় মে থেকে ডিসেম্বর মাসে। আবহাওয়াও সবচে বেশি খারাপ থেকে মে থেকে সেপ্টেম্বরে। বছরে এই আট মাসে মোট আশি হাজার থেকে এক লাখ টাকার মত মজুরি পাওয়া যায়। তিনি বললেন, বর্ষা হোক আর গরমকাল হোক সারবাছরই মাছ ধরা বিপদজনক সাগরে। পশ্চিম উপকূলে ফেয়ারওয়ে বয়ার দক্ষিণে যেখানে মাছ ধরতে যান তারা, সারাবছরই সাগর কমবেশি ‘গরম’ থাকে ওই এলাকায়।

শরণখোলা, বাগেরহাট। রায়েন্দা মাছঘাটে জেলেরা।
সন্তানরা গরিব থাকুক, তা চাননা শরণখোলার লোকেরা। চাষ করার মত যথেষ্ট জমি নাই, তারওপর কাজে না গিয়ে ছেলেমেয়েরা পড়ছে যেহেতু, তাই সংসারে খাবারাদি-কাপড়চোপড় সরবরাহ ঠিক রাখতে সাগরমুখো জেলেপেশায় নামছেন এককালের ক্ষেতচাষীরা। এটা মোবাইলে তোলা ছবি।

এসব শুনে শুনে ভয় বাড়ে ফারুকের স্ত্রি হাফিজা’র। হাফিজা বললেন, জানি উনি ফিরা আসতে নাও পারে। কিন্তু সাগরে না গেলে পোলমাইয়ারা কী খাবে?  উত্তর কদমতলা গ্রামের মিনারা বেগমও কখনো চাননি যে তার স্বামী সাগরে মাছ ধরতে যান। কিন্তু চার বছর আগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মত সাগরে মাছ ধরতে যান তার স্বামী আব্বাস আকন। ঝড়ে পড়ে তাদের বোট ডুবে যায়। মোট সতেরোজন জেলে ছিলেন। সবাই নিখোঁজ। তিন মেয়েকে নিয়ে চার বছর ধরে যন্ত্রণায় দিন কাটছে মিনারার।

মিনারা জানালেন, সংসারে খাবারাদি-টাকা পয়সার অভাবে তিন বছর আগে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, মেয়ের বয়স ছিল তখন ষোলো। ছয় মাস আগে মেঝো মেয়েকেও বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। মেঝো মেয়ের বয়স চৌদ্দ। মিনারা মনে করেন, মেয়েদের ভালোর জন্যই তিনি তাদের বিয়ে দিয়েছেন, আধপেটা খেয়ে থাকার চেয়ে জামাইর বাড়িতে গিয়ে অন্তত খেয়েপড়ে থাকতে পারছে তার মেয়েরা। ছোটো মেয়েকে নিয়ে তার দুজনের সংসার এখন। ক্লাস সিক্সে পড়েন তার ছোটো মেয়ে মরিয়ম।

তিনি নিজে একটা এনজিওর স্থানীয় অফিসে রান্নাবান্না ধোয়ামোছার কাজ করেন। মিনারা বললেন কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। কোমরে ব্যাথা, পায়ে ব্যাথা। টাকা পয়সার অভাবে ভালো ডাক্তার দেখাতে পারি না। ফজরের নামাজ পইরা কাজে বাইর হই, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি। অনেক কষ্ট। উনি সাগরে গিয়া নিখোঁজ না হইলে এই কষ্ট তো করা লাগতো না। মেয়েগুলারেও অল্প বয়সে বিয়া দেওন লাগতো না। রান্না কইরা বাচ্চাটারে খাওয়ামু যে সেইটাও পারি না এখন। এই বাচ্চা মেয়েটা আমার মাদরাসা থেইকা ফিরা নিজেই রান্না করে।

মিনারা জানালেন, চার বছর আগে একদিন সকালে রায়েন্দা বাজারের ঘাটের জেলেদের থেকেই উনি জানলেন যে ওনার স্বামী যেই নৌকায় ছিলেন ওই নৌকা ঝড়ের থেকে ফিরে নাই, কোনো খোঁজ খবর নাই। কেউ আর খুঁজলো না, কোথায় কার কাছে খবর নেবেন তাও আজও জানতে পারেন নাই তিনি। সতেরজন জেলে যে নিখোঁজ হয়েছেন তাদের কারোর পরিবারই জানে না। যেদিন সকালে এমন নিখোঁজ হবার খবর আসে, সেদিন সকাল সকাল রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থা সাগরে নেমে তাদের খোঁজখবর করতে শুরু করে কি? সেটাও জানা নেই এই শোকগ্রস্ত পরিবারগুলোর।

 

সাবেরা সুলতানা: সাবেরা সুলতানা শরণখোলা নিবাসী একজন শিক্ষিকা। আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের সহায়তায় ভয়েস পরিচালিত প্রকল্পে (২০১৮ সালে) তিনি কমুনিটি স্টোরিটেলিংয়ের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ চলাকালে তিনি এই কাজটি করেছেন।