Faraji Fishing Boat Owner
বোট মালিকরা তো চান ঝুঁকি কিভাবে কমায়ে রাখা যায়। নিজের নৌকার জেলেমাঝিদের তো কেউ আর বিপদে ফেলতে চান না। কিন্তু আমরা যখন কথা বললাম আরো আরো মালিকদের সাথে যে, বোটগুলা আরো নিরাপদ করতে, দুর্ঘটনায় আরো সাবধানে থাকতে কী করেন তারা, সেই বিষয়ে মনে হলো তাদের সামর্থ্য কম আছে।

আমার বাবা ও চাচা দুজনই মাছের আড়তদার। বাগেরহাটে আমাদের শরণখোলার রায়েন্দা বাজার ঘাটে আড়ত। সমুদ্রগামী বোট আছে তাদের। কাঠের বোট। ইঞ্জিনে চলে। বংশের মেয়ে হয়েও কখনো সাগরে মাছের ব্যবসা নিয়ে বাবা-চাচাদের থেকে কিছু জানতে চাই নাই। কিন্তু সাবেরা আপাদের সাথে নাগরিক সাংবাদিকতার ট্রেনিংয়ে গিয়ে যখন জেলেমাঝিদের নিয়ে কথা হলো, তখন আগ্রহ হলো এই কাহিনী নিয়াই আমি কাজ করবো। আমাদের বাপ-চাচাদের বোটে অনেক মাঝিরা কাজ করে।

ট্রেনিংয়ের সময় সাবেরা আপা একটা কাজ করতেছিলেন সাগরে তুফানে নিখোঁজ মাঝিদের ফ্যামিলির সাথে কথা বলার। এইসব বিষয় নিয়ে আমি চাচা মুজিবুর হোসেন তালুকদারের সাথে অনেক সময় কথা বললাম। চাচা বললেন, সাগরে মাছ ধরতে বোটে যাওয়া ছাড়াও তো এলাকায় অন্য কিছু কাজের সুযোগ আছে, মাঝিরা এলাকায় অনেক কাজ করতে পারে। কিন্তু একবার যিনি সাগরে গেছেন তিন আর এলাকায় কাজ করতে চান না। কারণ বেশি পাওয়ার আশা। মাঝিরা নিজেদের জীবন ‘মৃত্যুর দুয়ারে’ রেখে সাগরে যায়, কারণ একটা ট্রিপে ভালো মাছ ধরা পড়লে যে টাকা পাবে ভাগের মজুরি সেটা এলাকায় দুই মাস অন্য কাজ করেও পাবে না। এই একটু ভালো রোজগারের আশায় আমাদের বোটের মাঝিরা ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যায়।

Artisanal Fishing Boat
বাগেরহাটে আমাদের শরণখোলার রায়েন্দা বাজার ঘাটে সমুদ্রগামী বোট। কাঠে বানানো এমন বোটগুলা ইঞ্জিনে চলে। এমন একেকটা বোটে বারোজন থেকে শুরু করে আঠারোজন জেলেমাঝি সাগরে মাছ ধরতে যান। জেলেদের অভিজ্ঞতা হলো বোটগুলো সাগরের খারাপ আবহাওয়ার উপযোগী না। তবে এরচেয়ে বড়, নিরাপদ, ও ভালো বোট বানানোর আর্থিক সামর্থ্য নাই মালিকদের। বোট তৈরির বিনিয়োগ, প্রতি ট্রিপের তেল খরচ-বাজার খরচ-জাল মেরামতের খরচ এসবই ব্যক্তিগতভাবে যোগাড় করতে হয়। ব্যাংক বা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো লোন পাওয়া যায় না।

মুজিবুর তালুকদারের ব্যবসার অভিজ্ঞতা হলো ‘সবসময় একই ধরনের লাভ হয় না, একেক সময় একেক রকমের। মাছ যেহেতু সব বছর বা সব মাসে সমান পাওয়া যায় না। তিনি বললেন, ‘বছরের মধ্যে এমনও আছে যে পাঁচটি ট্রিপ ভালো হতে পারে আবার এমনও আছে যে কোন বছর একটা ট্রিপও ভালো হয় না। তবে মোটামুটি লাভের দিকটা ভালোই হয় কম আর বেশি। লাভ কম বেশি যা হয় মোটামুটি ভালোই।

সাগরে পেশাগত ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে অবশ্য বোট মালিকদের তেমন পড়তে হয় না। কারণ মালিকরা সাধারণত সাগরে মাছ ধরতে যান না। দুএকজন হয়তো যান। তালুকদার চাচা বললেন, ঝড়তুফান আর দুর্ঘটনার বিপদ সামলাতে হয় জেলেমাঝিদেরই। জীবন হাতে নিয়ে সাগরে যান তারা। আর বোট মালিকরা তাদের জীবন নিয়ে বাড়িতে বসে থাকেন, শুধু নিজের জীবনটাই মালিকদের কাছে থাকে, কিন্তু তার বাদে আর যা ছিল তার সব ধনসম্পদ ওই সাগরে বোটেই পাঠায় দেয়া হয়।

বোট তৈরির বিনিয়োগ, প্রতি ট্রিপের তেল খরচ-বাজার খরচ-জাল মেরামতের খরচ এসবই ব্যক্তিগতভাবে যোগাড় করতে হয়। ব্যাংক বা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো লোন পাওয়া যায় না। মুজিবুর তালুকদার বললেন, নিজের বাড়ির দলিল পর্যন্ত অন্যের কাছে জমা দিয়েই টাকা আনতে হয়। তার ভাষায়, ‘নদীর ব্যবসা এমন একটি ব্যবসা যেখানে লাভ-লোকসান- মৃত্যুর আহাজারি সবই বেশি বেশি।

Artisanal Fishing Boat Owner
আমার বংশের মাছের ব্যবসা। ছবিতে আমার বাবাকে দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রগামী একটা বোটের মালিক আমার বাবা। আমার বাপ-চাচাদের মতে, যতটুকু সামর্থ্য আছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো বোটটাই বানানোর চেষ্টা করেন মালিকরা। ভালো কাঠ, ভালো ইঞ্জিন, আর বাজারে সেরা সবচে ভালো বোট মিস্তিরিকেই খুঁজে আনেন তারা।

প্রতি ট্রিপের লাভের সিংহভাগ মালিকের ভাগেই থাকে। জেলেমাঝিরা এলাকার  অন্যান্য পেশার চেয়ে বেশি মজুরি পান সত্য। কিন্তু তারপরও ঝুঁকি নিয়ে এমন ছোট ছোট ও অনিরাপদ বোটে যেতে হয় তাদের। এই ঝুঁকি ও অনিরাপত্তার পরেও মালিকরা এত এত মাছশ্রমিক পাচ্ছেন কিভাবে?

চাচা বললেন, মাছ ধরার মাঝে অনেক ভালো লাগা কাজ করে। যারা জেলেমাঝি তারা সাগরে যখন মাছ পায় তখন অনেক আনন্দ পায়। সাগরের অন্য রকম একটা টান আছে। একবার যে মজা পায় সে বারবার যেতে চায়। অন্য কাজে আর ভালো লাগে না। তার ভাষায়, সব কথার এক কথা যারা জেলে তারা এমনিতেই এলাকায় অনেক গরিব, অনেক কষ্ট করে তারা জীবন যাপন করে। তাদের জীবনটাই হয়তো এলাকার সবার জীবনের থেকে কষ্টকর। তাই সাগরে মাছ ধরায় ঝুঁকি থাকলেও বেশি আয় আছে। পরিবারকে একটু ভালো রাখার জন্যই তারা ঝুঁকি নেন।

বোট মালিকরা তো চান ঝুঁকি কিভাবে কমায়ে রাখা যায়। নিজের নৌকার জেলেমাঝিদের তো কেউ আর বিপদে ফেলতে চান না। কিন্তু আমরা যখন কথা বললাম আরো আরো মালিকদের সাথে যে, বোটগুলা আরো নিরাপদ করতে, দুর্ঘটনায় আরো সাবধানে থাকতে কী করেন তারা, সেই বিষয়ে মনে হলো তাদের সামর্থ্য কম আছে। বোট মালিকরা বোট বানানোর জন্য বাজারের সবচে ভালো কাঠটা কেনার চেষ্টা করেন, সবচে ভালো মিস্তিরিকে খুঁজে আনেন, ইঞ্জিন চান সেরা, সবচে মজবুত বোটটাই তারা বানাতে চান।

কিন্তু সাবধানে বোট চালাতে কাজে লাগে, অথবা ঝড়তুফানের সময় বিপদে কাজে লাগে এমন যন্ত্রপাতির খোঁজখবর তো বোট মালিকদের জানা নাই।

 

————————–

আরিফা আক্তার: শরণখোলা নিবাসী আরিফা আক্তার  বিএ পড়ছেন কলেজে।  আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের সহায়তায় ভয়েস পরিচালিত প্রকল্পে (২০১৮ সালে) তিনি কমুনিটি স্টোরিটেলিংয়ের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ চলাকালে তিনি এই কাজটি করেছেন।